গণতন্ত্র মানে একগুঁয়েমি নয় ড. কর্নেল অলি আহমদ (অব.) বীরবিক্রম, এমপি

সরকার বিগত সাড়ে চার বছরের অপশাসনের কারণে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে এখন ক্ষমতা হারানোর আতঙ্কে প্রমাদ গুনছে। তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে জুলুম-নির্যাতন ও দলন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। বর্তমান সরকারকে জনগণ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। কারণ এ সরকার যখনই ক্ষমতায় আসে দেশের জনগণ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারের মেয়াদ যতই শেষ পর্যায়ে আসছে তারা জনগণের ওপর জুলুম বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং জনতার ক্ষোভও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমতাবস্থায় ব্যর্থ আওয়ামী লীগ সরকার গণবিস্ফোরণ ও গণঅভ্যুত্থানের আশঙ্কায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে জনগণের সঙ্গে অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করেছে। কিন্তু অতীতে জনগণের ওপর দলন-পীড়ন, নির্যাতন চালিয়ে কোনো সরকারের শেষ রক্ষা হয়নি, আওয়ামী লীগেরও শেষ রক্ষা হবে না।

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন অতঃপর কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সর্বশেষ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের অনাস্থা ব্যক্ত করেছে। সরকার বুঝতে পারছে কিনা জানি না।

সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিতর্কিত রায় সারা দেশ এবং জনগণকে অন্ধকার গর্তে ঠেলে দিয়েছে। এ রায়ের ফলে দেশের রাজনীতি বিধ্বস্ত, গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে বহু বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত, হাইকোর্টের মামলার রায়ে বৈধ হিসেবে বিবেচিত। অথচ সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সভাপতিত্বে তার অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে তড়িঘড়ি করে একটি বিতর্কিত রায় প্রদান করেন। এই রায়ে বলা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন থেকে অবৈধ। এ ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীতে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা বিরোধী দলকে আরও দুর্বল করার লক্ষ্যে ব্যবহার করা যাবে। মুক্তচিন্তা, বহু মতের চর্চা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রুদ্ধ করার সুযোগও সৃৃষ্টি হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের এই বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে। গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে হলে পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নতুন সংশোধন আনয়ন একান্ত বাঞ্ছনীয়। দেশের জনগণ এবং দেশকে বাঁচাতে হবে। আপস বা আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া পরাজয় নয়। যারা দেশ পরিচালনা করেন তাদের সব সময় উদ্যোগ নিতে হয়।

বড় সংকটাপন্ন সময়ের মধ্যদিয়ে জাতি জীবন অতিবাহিত করছে। এখন মানুষের জীবনের মূল্য সবচেয়ে কম। প্রতিনিয়ত মানুষ মারা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে। মানবতার এই দুঃসময়ে পুরো বাংলাদেশই যেন আজ এক উত্তপ্ত কড়াই। এ কড়াইয়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ১৬ কোটি মানুষ। প্রতিনিয়ত জ্বলছেন তারা। সংঘাতের রাজনীতি অবশ্য বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। সব দলের অংশগ্রহণে সংলাপ নিয়েও আলোচনা চলছে সর্বত্র। সংঘর্ষের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন সমঝোতার। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে অতি দ্রুতই সমঝোতায় পেঁৗছতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। এ সংকট থেকে উত্তরণের আপাতত একমাত্র পন্থা যে নামেই হোক না কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বহাল। তা হলে স্বাভাবিক নিয়মে সংসদের পাঁচ বছর পূরণ করা কঠিন নাও হতে পারে। বর্তমান সরকার দেশ এবং জনগণকে ভালোবাসে, তা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করার এখনই উত্তম সময়। বর্তমান সংসদের অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই তা করতে হবে।

বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরের কর্মকাণ্ড দেশকে একটি ব্যর্থ সরকারে পরিণত করেছে। দুর্নীতিতে দেশ ভরে গেছে। শেয়ারমার্কেট, হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারিতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি নিত্যদিনের ঘটনা, দলের মধ্যে এবং মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে আত্দকলহ সংকটকে আরও তীব্রতর করেছে। দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও তারা একদলীয় শাসনে বিশ্বাসী। তারা অত্যাচার নির্যাতন ও হামলা-মামলা দিয়ে বিএনপিসহ বিরোধী দলের হাজার হাজার কর্মীকে জেলে পুরেছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে দেশে ১০ জন মানুষ খুন হচ্ছে এবং ৫০ জন নারী সম্ভ্রম হারাচ্ছে। এগুলো সব হয়েছে সরকার পরিচালনা অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে চমক দেখাতে গিয়ে। অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে যাদের আনা হয়েছে তারা দেশ পরিচালনার পরিবর্তে লুটপাটে বেশি ব্যস্ত হওয়ায় এমনটি হয়েছে। 'গুরু মারা বিদ্যা, হিতে বিপরীত হয়েছে।' চাটুকাররা নিজের পরিবারের এবং আত্দীয়-স্বজনদের স্বার্থরক্ষার জন্য কখনোই সৎ পরামর্শ দিতে সাহস পায় না। তারা নেতাদের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত পোষণ করে। তাদের মতে কর্তা কখনো ভুল করতে পারেন না। মানুষ মাত্রই ভুল করে_ এ কথাটি সর্বদা স্মরণ রাখা উচিত। তোষামোদকারীদের কারণে অনেক সময় নেতারা স্বাধীনভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করতে পারেন না। ফলে জনগণ এবং নিজের দলের নেতাকর্মীদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। সৎ ও দক্ষ রাজনীতিবিদরা মুখের ওপরে কথা বলবে, তর্ক করবে, তবে কখনো দলের নেতা, দল, দলের নেতাকর্মী এবং দেশের জনগণকে বিপদের দিকে ঠেলে দেবেন না। সৎ এবং সঠিক পরামর্শ দেবেন ও বিপদের সময় পাশে থাকবেন। অন্যদিকে তোষামোদকারী এবং চাটুকাররা কখনো বিপদের সময় জনগণের মুখোমুখি হয় না। দূরত্বে এবং নিরাপদে আশ্রয় নেয়।

কবির ভাষায় বলতে হয়_

অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়

সুসময়ে অনেকে বন্ধু বটে হয়।

দেশ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল অভিজ্ঞ এবং প্রবীণদের মেধা কাজে লাগানো; কিন্তু আমরা তাদের ভয় পাই। আমাদের বুঝতে হবে এ ধরনের নেতারা সঙ্গে থাকলে কখনো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জেলে যেতে হয় না। আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে, বর্তমান দেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে জেলে যাওয়ার পালা এবার কিন্তু তাদের। বিএনপি বা ১৮ দলের নয়। সুতরাং রজনী ধীরে চল। অহংকার পরিহার কর। প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আস। গণতন্ত্র হলো আলোচনার মাধ্যমে সরকার পরিচালনা। একগুঁয়েমির মাধ্যমে নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নয়। কটূক্তি করে নয়। মানুষের কথা বলা অর্থাৎ সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা বন্ধ করতে না পারলে বুঝতে হবে, সরকার তখন সফলতা লাভ করেনি। সমালোচনা তখনই বন্ধ হয় সরকার যখন সঠিক পথে চলে।

আমরা যারা বিরোধী শিবিরে অবস্থান করছি এবং আগামী দিন সরকার গঠনের মনমানসিকতা নিয়ে পরিকল্পনায় লিপ্ত রয়েছি, আমাদেরও উচিত শত্রু-মিত্র, লোভী-তোষামোদকারী এবং যারা সময়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রং বদলায়, সময় বুঝে ছদ্মবেশ ধারণ করে তাদের চিহ্নিত করে সাবধান হওয়া। অন্যথায় পুরনো গর্তে আবারও পড়তে হবে।

আত্দত্যাগ মানুষকে মহৎ করে। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এবং জীবন্ত কিংবদন্তি দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ভারতের সোনিয়া গান্ধী। প্রকৃত অর্থে নিজেদের দেশে তাদের আসন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির উপরে। দেশ কিভাবে চলবে তারাই ঠিক করেন। পৃথিবীর কাছে তারা মহামানব। কারণ তারা ভোগের রাজনীতি থেকে ত্যাগের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যোগ্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে তাদের কাজে লাগিয়েছেন। ফলে দল, দেশ এবং জনগণ উপকৃত হয়েছে। তারাও হয়েছেন মহান।

২০০৯ সালের ৪ জানুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে আসার পথে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হই। সবাই সম্মিলিতভাবে একটি প্রশ্ন করেছিলেন আওয়ামী লীগের এই বিরাট এবং বিশাল বিজয়কে আপনি কিভাবে দেখেন? উত্তরে আমি বলেছিলাম, এটি আওয়ামী লীগের জন্য অশনি সংকেত। এখন তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে।

রাজনীতিতে এবং সরকার পরিচালনায় সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন যোগ্য অভিভাবক, দিকনির্দেশনা এবং সরকার পরিচালনার মতো সৎ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। যার দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করেছিল কিন্তু যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং দক্ষ রাজনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্তি ছিল না।

লেখক : সংসদ সদস্য ও চেয়ারম্যান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি

- See more at: http://www.bd-pratidin.com/2013/07/26/7649#sthash.uBXlfYxm.dpuf

সরকার বিগত সাড়ে চার বছরের অপশাসনের কারণে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে এখন ক্ষমতা হারানোর আতঙ্কে প্রমাদ গুনছেতারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে জুলুম-নির্যাতন ও দলন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছেবর্তমান সরকারকে জনগণ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় নাকারণ এ সরকার যখনই ক্ষমতায় আসে দেশের জনগণ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়সরকারের মেয়াদ যতই শেষ পর্যায়ে আসছে তারা জনগণের ওপর জুলুম বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং জনতার ক্ষোভও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছেএমতাবস্থায় ব্যর্থ আওয়ামী লীগ সরকার গণবিস্ফোরণ ও গণঅভ্যুত্থানের আশঙ্কায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে জনগণের সঙ্গে অসংলগ্ন আচরণ করতে শুরু করেছেকিন্তু অতীতে জনগণের ওপর দলন-পীড়ন, নির্যাতন চালিয়ে কোনো সরকারের শেষ রক্ষা হয়নি, আওয়ামী লীগেরও শেষ রক্ষা হবে না

বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন অতঃপর কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সর্বশেষ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরনের অনাস্থা ব্যক্ত করেছে সরকার বুঝতে পারছে কিনা জানি না

সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বিতর্কিত রায় সারা দেশ এবং জনগণকে অন্ধকার গর্তে ঠেলে দিয়েছেএ রায়ের ফলে দেশের রাজনীতি বিধ্বস্ত, গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধতত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে বহু বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত, হাইকোর্টের মামলার রায়ে বৈধ হিসেবে বিবেচিতঅথচ সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সভাপতিত্বে তার অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে তড়িঘড়ি করে একটি বিতর্কিত রায় প্রদান করেনএই রায়ে বলা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন থেকে অবৈধএ ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীতে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা বিরোধী দলকে আরও দুর্বল করার লক্ষ্যে ব্যবহার করা যাবেমুক্তচিন্তা, বহু মতের চর্চা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রুদ্ধ করার সুযোগও সৃৃষ্টি হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের এই বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমেগণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে হলে পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নতুন সংশোধন আনয়ন একান্ত বাঞ্ছনীয়দেশের জনগণ এবং দেশকে বাঁচাতে হবেআপস বা আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া পরাজয় নয়যারা দেশ পরিচালনা করেন তাদের সব সময় উদ্যোগ নিতে হয়

বড় সংকটাপন্ন সময়ের মধ্যদিয়ে জাতি জীবন অতিবাহিত করছেএখন মানুষের জীবনের মূল্য সবচেয়ে কমপ্রতিনিয়ত মানুষ মারা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতেমানবতার এই দুঃসময়ে পুরো বাংলাদেশই যেন আজ এক উত্তপ্ত কড়াইএ কড়াইয়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন

১৬ কোটি মানুষপ্রতিনিয়ত জ্বলছেন তারাসংঘাতের রাজনীতি অবশ্য বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা হচ্ছেসব দলের অংশগ্রহণে সংলাপ নিয়েও আলোচনা চলছে সর্বত্রসংঘর্ষের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন সমঝোতার তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছেক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে অতি দ্রুতই সমঝোতায় পেঁৗছতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেএ সংকট থেকে উত্তরণের আপাতত একমাত্র পন্থা যে নামেই হোক না কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বহাল তা হলে স্বাভাবিক নিয়মে সংসদের পাঁচ বছর পূরণ করা কঠিন নাও হতে পারে বর্তমান সরকার দেশ এবং জনগণকে ভালোবাসে, তা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করার এখনই উত্তম সময়বর্তমান সংসদের অধিবেশন শেষ হওয়ার আগেই তা করতে হবে

বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরের কর্মকাণ্ড দেশকে একটি ব্যর্থ সরকারে পরিণত করেছে দুর্নীতিতে দেশ ভরে গেছেশেয়ারমার্কেট, হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারিতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছেটেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি নিত্যদিনের ঘটনা, দলের মধ্যে এবং মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে আত্দকলহ সংকটকে আরও তীব্রতর করেছেদেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছেআওয়ামী লীগ মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও তারা একদলীয় শাসনে বিশ্বাসীতারা অত্যাচার নির্যাতন ও হামলা-মামলা দিয়ে বিএনপিসহ বিরোধী দলের হাজার হাজার কর্মীকে জেলে পুরেছেদেশের আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি হয়েছেপ্রতিদিন গড়ে দেশে ১০ জন মানুষ খুন হচ্ছে এবং ৫০ জন নারী সম্ভ্রম হারাচ্ছেএগুলো সব হয়েছে সরকার পরিচালনা অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে চমক দেখাতে গিয়েঅভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে যাদের আনা হয়েছে তারা দেশ পরিচালনার পরিবর্তে লুটপাটে বেশি ব্যস্ত হওয়ায় এমনটি হয়েছে'গুরু মারা বিদ্যা, হিতে বিপরীত হয়েছে' চাটুকাররা নিজের পরিবারের এবং আত্দীয়-স্বজনদের স্বার্থরক্ষার জন্য কখনোই সৎ পরামর্শ দিতে সাহস পায় নাতারা নেতাদের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত পোষণ করেতাদের মতে কর্তা কখনো ভুল করতে পারেন নামানুষ মাত্রই ভুল করে_ এ কথাটি সর্বদা স্মরণ রাখা উচিততোষামোদকারীদের কারণে অনেক সময় নেতারা স্বাধীনভাবে চিন্তা ও বিশ্লেষণ করতে পারেন নাফলে জনগণ এবং নিজের দলের নেতাকর্মীদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণসৎ ও দক্ষ রাজনীতিবিদরা মুখের ওপরে কথা বলবে, তর্ক করবে, তবে কখনো দলের নেতা, দল, দলের নেতাকর্মী এবং দেশের জনগণকে বিপদের দিকে ঠেলে দেবেন নাসৎ এবং সঠিক পরামর্শ দেবেন ও বিপদের সময় পাশে থাকবেনঅন্যদিকে তোষামোদকারী এবং চাটুকাররা কখনো বিপদের সময় জনগণের মুখোমুখি হয় না দূরত্বে এবং নিরাপদে আশ্রয় নেয়

কবির ভাষায় বলতে হয়_

অসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়

সুসময়ে অনেকে বন্ধু বটে হয়

দেশ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল অভিজ্ঞ এবং প্রবীণদের মেধা কাজে লাগানো; কিন্তু আমরা তাদের ভয় পাইআমাদের বুঝতে হবে এ ধরনের নেতারা সঙ্গে থাকলে কখনো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জেলে যেতে হয় নাআওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে, বর্তমান দেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে জেলে যাওয়ার পালা এবার কিন্তু তাদেরবিএনপি বা ১৮ দলের নয়সুতরাং রজনী ধীরে চলঅহংকার পরিহার করপ্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসগণতন্ত্র হলো আলোচনার মাধ্যমে সরকার পরিচালনাএকগুঁয়েমির মাধ্যমে নয়ক্ষমতার অপব্যবহার করে নয়কটূক্তি করে নয়মানুষের কথা বলা অর্থাৎ সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা বন্ধ করতে না পারলে বুঝতে হবে, সরকার তখন সফলতা লাভ করেনি সমালোচনা তখনই বন্ধ হয় সরকার যখন সঠিক পথে চলে

আমরা যারা বিরোধী শিবিরে অবস্থান করছি এবং আগামী দিন সরকার গঠনের মনমানসিকতা নিয়ে পরিকল্পনায় লিপ্ত রয়েছি, আমাদেরও উচিত শত্রু-মিত্র, লোভী-তোষামোদকারী এবং যারা সময়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রং বদলায়, সময় বুঝে ছদ্মবেশ ধারণ করে তাদের চিহ্নিত করে সাবধান হওয়াঅন্যথায় পুরনো গর্তে আবারও পড়তে হবে

আত্দত্যাগ মানুষকে মহৎ করেতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এবং জীবন্ত কিংবদন্তি দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ভারতের সোনিয়া গান্ধীপ্রকৃত অর্থে নিজেদের দেশে তাদের আসন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির উপরেদেশ কিভাবে চলবে তারাই ঠিক করেনপৃথিবীর কাছে তারা মহামানবকারণ তারা ভোগের রাজনীতি থেকে ত্যাগের রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেনযোগ্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে তাদের কাজে লাগিয়েছেনফলে দল, দেশ এবং জনগণ উপকৃত হয়েছেতারাও হয়েছেন মহান

২০০৯ সালের ৪ জানুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে আসার পথে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হই সবাই সম্মিলিতভাবে একটি প্রশ্ন করেছিলেন আওয়ামী লীগের এই বিরাট এবং বিশাল

বিজয়কে আপনি কিভাবে দেখেন? উত্তরে আমি বলেছিলাম, এটি আওয়ামী লীগের জন্য অশনি সংকেতএখন তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে

রাজনীতিতে এবং সরকার পরিচালনায় সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন যোগ্য অভিভাবক, দিকনির্দেশনা এবং সরকার পরিচালনার মতো সৎ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদযার দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করেছিল কিন্তু যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং দক্ষ রাজনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্তি ছিল না

লেখক : সংসদ সদস্য ও চেয়ারম্যান, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি

 
  ©Liberal Democrative party,LDP of Bangladesh (Official Website)